বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ ২০২৬, ০৩:২৪ পূর্বাহ্ন

মোঃরেজাউল হক রহমত,নবীনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের ছলিমগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়িতে চারদিন ধরে হেফাজতে থাকার পর আব্দুল্লাহ (২৭) নামে এক যুবকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এলাকাজুড়ে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। রোববার (২৮ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনার জেরে সোমবার সকাল থেকেই উত্তেজিত জনতা ছলিমগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ি ঘেরাও করে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ফাঁড়ি বন্ধ করে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।
নিহত আব্দুল্লাহ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার তেজখালী ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামের আবুল মিয়ার ছেলে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ২৩ সেপ্টেম্বর সকালে সলিমগঞ্জ বাজারের সিএনজি স্ট্যান্ড থেকে মাস্ক পরা অবস্থায় স্থানীয় কয়েকজন আব্দুল্লাহকে ধরে মারধর করে বাড়িতে নিয়ে যায় এবং সেখানেই তার ওপর ভয়াবহ শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ছলিমগঞ্জ অস্থায়ী পুলিশ ফাঁড়িতে সোপর্দ করা হয়। পরিবারের অভিযোগ, পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থাতেও তার উপর নির্যাতন চলতে থাকে।
স্থানীয় সূত্র এবং পরিবারের সদস্যদের দাবি, ছলিমগঞ্জ ইউনিয়নের বাড়াইল গ্রামে নগদ অর্থ চুরির একটি অভিযোগকে কেন্দ্র করে এই ঘটনা ঘটে। পুলিশ আব্দুল্লাহকে আটক করে চারদিন ধরে ফাঁড়িতে আটকে রাখে, অথচ নবীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কিংবা অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে কোনো ধরনের অবহিত করা হয়নি।
এ সময় আরও দুইজন—রাব্বি ও মাসুদ রানাকে গ্রেপ্তার করে জেলা হাজতে পাঠানো হলেও আব্দুল্লাহকে গোপনে ফাঁড়িতে আটকে রাখা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
আব্দুল্লাহর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে প্রথমে তাকে সলিমগঞ্জ অলিউর রহমান জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তিনদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর অবস্থার অবনতি হলে তাকে সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। রোববার (২৮ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
এ ঘটনায় নিহতের ছোট ভাই সাকিল মিয়া বাদী হয়ে সোমবার (২৯ সেপ্টেম্বর) নবীনগর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় ছলিমগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. মহিউদ্দিনসহ চারজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ২০–২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, অভিযুক্তরা যৌথভাবে আব্দুল্লাহর উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে পরিকল্পিতভাবে তার মৃত্যুর জন্য দায়ী।
আব্দুল্লাহর মৃত্যুর খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় জনতা বিক্ষুব্ধ হয়ে সোমবার সকাল ৯টার দিকে ছলিমগঞ্জ ফাঁড়ি ঘেরাও করে বিক্ষোভ করে। এক পর্যায়ে তারা মানববন্ধনেও অংশ নেয়। ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার কারণে প্রশাসন ফাঁড়িটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনা সদস্য মোতায়েন করে।
ঘটনার পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার এহতেশামুল হক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং ছলিমগঞ্জ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. মহিউদ্দিনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়। পরে সোমবার দুপুর ৩টার দিকে তাকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
তবে এখনও পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিবৃতি প্রদান করা হয়নি, যা নিয়ে জনমনে আরও প্রশ্ন ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
এ ঘটনায় এলাকাবাসী ও নিহতের পরিবার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। তারা জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর মতো ঘটনা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।