রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:১২ অপরাহ্ন

মো. সেলিম উদ্দিন খাঁন
ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে চলমান বিরোধে আপাতত মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ায় যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। সংস্থাটির বক্তব্য, এখনও মধ্যস্থতায় যাওয়ার মতো পরিস্থিতি আসেনি। বিষয়টি বাংলাদেশের আদালতে বিচারাধীন।
গত রোববার সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক সালিশ কেন্দ্রের (এসআইএসি) রেজিস্ট্রারের কাছে পাঠানো পিডিবির চিঠিতে এ অবস্থানের কথা জানানো হয়। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক (কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন) প্রকৌশলী মকসুদুর রহমান ও সচিব রাশেদুল হক প্রধানের সই করা ওই চিঠিতে বলা হয়, আদানি পাওয়ার ৩০ অক্টোবর চিঠিতে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির (পিপিএ) ধারা ১৯.৩(খ) অনুযায়ী মধ্যস্থতা প্রক্রিয়া শুরু করার প্রস্তাব দেয়।
এর আগে আদানি ও পিডিবির শীর্ষ নির্বাহীদের মধ্যে বৈঠকে বিরোধ নিষ্পত্তি হয়নি। চুক্তি অনুযায়ী দ্বিতীয় ধাপে মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ দেওয়ার কথা রয়েছে। আদানি ইতোমধ্যে আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ডাক্সটোন হিল চেম্বার্স এবং সিঙ্গাপুরের দ্য আর্বিট্রেশন চেম্বার্সকে নিয়োগ দিয়েছে। পিডিবিকে মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ দেওয়ার জন্য চিঠি দিয়েছে। তবে পিডিবি আপাতত মধ্যস্থতায় যেতে রাজি নয়। নিয়ম অনুযায়ী পিডিবি মধ্যস্থতায় না গেলেও আন্তর্জাতিক আদালতে সালিশি কার্যক্রম শুরু হতে পারে।
চিঠিতে পিডিবি জানিয়েছে, চুক্তির ধারা ১৯.৩ অনুসারে মধ্যস্থতা সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক ও আইনত বাধ্যতামূলক নয়। ধারা ১৯.৩(ক)-এ বলা আছে, পক্ষগুলো চাইলে বিরোধ বিবেচনার জন্য বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠাতে পারে এবং সুপারিশ পেতে পারে। তবে ধারা ১৯.৩(ঘ) অনুযায়ী সেই বিশেষজ্ঞের মতামত বা সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত ও বাধ্যতামূলক নয়। যে কোনো পক্ষ চাইলে পরবর্তী ধারা ১৯.৪ অনুযায়ী সালিশি প্রক্রিয়ায় যেতে পারে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি সংশ্লিষ্ট অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ বর্তমানে বাংলাদেশের হাইকোর্টের রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্তাধীন। সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো আদালতের নির্দেশে বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। এসব অভিযোগ আদানির অনুরোধ করা বিরোধের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পর্কিত হতে পারে। তাই এখনি সমঝোতায় যাওয়া উচিত হবে না।
চিঠিতে ৫ অক্টোবরের আরেক চিঠির উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, এই তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মধ্যস্থতা শুরু করা সময় ও অর্থের অপচয়। কারণ, বিরোধের বিষয়টি পরিষ্কার নয়। এতে বিপুল অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত। এই মুহূর্তে মধ্যস্থতা শুরু করলে তা উভয় পক্ষের জন্য ক্ষতিকর হবে।
চিঠিতে পিডিবি জানায়, তদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর প্রয়োজনে অন্য কোনো প্ল্যাটফর্মে গিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তবে তার আগে মধ্যস্থতা প্রক্রিয়া শুরু করা অনুচিত। বিপিডিবি রেজিস্ট্রারকে অনুরোধ করেছে– বিশেষজ্ঞ নিয়োগের বিষয়ে আপাতত কোনো পদক্ষেপ না নিতে।
সংস্থাটি সতর্ক করে জানিয়েছে, পিডিবির আপত্তি উপেক্ষা করে যদি রেজিস্ট্রার উভয় পক্ষের ওপর বিশেষজ্ঞ নিয়োগ চাপিয়ে দেন, তবে ওই প্রক্রিয়ায় গৃহীত খরচের দায় তারা নেবে না। এই ব্যয়ভার বহন করতে হবে আদানি পাওয়ার বা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞকে।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে পিডিবি চেয়ারম্যান রেজাউল করিম বলেন, ‘এই মুহূর্তে কিছু বলতে পারব না … অপেক্ষা করুন।’
কয়লার দাম নিয়ে বিরোধ
২৫ বছর মেয়াদি আদানির চুক্তি নিয়ে শুরু থেকে সমালোচনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তির পরতে পরতে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী শর্ত রয়েছে। তবে পিডিবি ও আদানির মধ্যে মূল বিরোধ শুরু হয় কয়লার দাম নিয়ে। পিডিবির দাবি, চুক্তির শর্তের মারপ্যাঁচে অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় আদানির প্রতি টন কয়লায় দাম ১০ থেকে ১২ ডলার বেশি পড়ছে। বার বার চিঠি দিয়ে বৈঠক করেও পিডিবি কয়লার দাম নিয়ে আদানির সঙ্গে সমাধানে যেতে পারেনি।
চুক্তিতে অনিয়ম
গত বছর অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগ আমলে করা বড় বিদ্যুৎ চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করতে বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে। এই কমিটি গত রোববার বিদ্যুৎ বিভাগে খসড়া প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, আদানিসহ অধিকাংশ বিদ্যুৎ চুক্তিতে অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। আমলা এবং রাজনীতিবিদদের যোগসাজশে এসব দুর্নীতি হয়েছে। কমিটির সদস্য আইনজীবী শাহ্দীন মালিক বলেন, আদানির চুক্তি বাতিল করার যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান এ বিষয়ে সাংবাদিকদের বলেন, আদানির চুক্তিতে যদি কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়, তাহলে বাতিল করতে দ্বিধা করবেন না।
আদানির কাছ থেকে বিদ্যুৎ কিনতে ২০১৭ সালের ৫ নভেম্বর চুক্তি করে বাংলাদেশ। ২৫ বছর মেয়াদি ওই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে বিদ্যুৎ দিতে ভারতের ঝাড়খণ্ডের গড্ডায় ২০০ কোটি ডলার ব্যয়ে এক হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করে আদানি পাওয়ার। কেন্দ্রটি থেকে গতকাল সোমবার রাত ৮টায় বাংলাদেশ এক হাজার ৩০৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পায়।