শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৯:২৮ পূর্বাহ্ন

মোঃ রেজাউল হক রহমত, ব্রাক্ষণবাড়িয়া প্রতিনিধি:
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারে ঘটেছে এক ভয়াবহ ও নজিরবিহীন ঘটনা। চরম দায়িত্বহীনতা ও প্রশাসনিক গাফিলতির সুযোগ নিয়ে একটি হত্যা মামলার হাজতি অন্য বন্দির নাম–ঠিকানা ও জামিন কাগজ ব্যবহার করে প্রকাশ্যেই কারাগার থেকে পালিয়ে গেছে। এই ঘটনায় কারা প্রশাসনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও জবাবদিহিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনার দায়ে ডেপুটি জেলারসহ মোট ৮ জন কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীকে তাৎক্ষণিকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।
কারা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, পলাতক হাজতির নাম হৃদয় (২৮)। তিনি কসবা থানার নিমবাড়ি এলাকার মুজিবুর মিয়ার ছেলে। তার হাজতি নম্বর ১২০০৪। হৃদয় আখাউড়া থানার জিআর–৪২০/২০১৮ নম্বরের একটি হত্যা মামলার আসামি। গত ৭ ডিসেম্বর ২০২৫ তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।
ঘটনাটি ঘটে বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি ২০২৬) সকাল আনুমানিক ১১টা ২৫ মিনিটে। সেদিন কারাগারে জামিনপ্রাপ্ত বন্দিদের মুক্তি কার্যক্রম চলছিল। সেই সুযোগে নবীনগর থানার জিডি নম্বর ৭৪২/১৫১ ধারার মামলায় অব্যাহতিপ্রাপ্ত হাজতি দিদার হোসেন (হাজতি নম্বর ৪৮১/২৬)-এর নাম, ঠিকানা ও জামিন কাগজ ব্যবহার করে হৃদয় কৌশলে কারাগার থেকে বেরিয়ে যায়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—মুক্তির পুরো প্রক্রিয়ায় কারাগারের গেট শাখা, মুক্তি শাখা, ভর্তি শাখা, কারাভ্যন্তর গোয়েন্দা, আইসিটি এবং পিআইডিএস শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউই এই গুরুতর প্রতারণা শনাক্ত করতে পারেননি। প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, আদালতের জামিন ও খালাস সংক্রান্ত কাগজপত্র যথাযথভাবে যাচাই না করা বন্দির পরিচয় নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা গেট পর্যায়ে কার্যকর নজরদারির অভাব এই তিনটি মারাত্মক গাফিলতির কারণেই এ পলায়নের ঘটনা ঘটে।
এতে কারা ব্যবস্থাপনার নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিয়ে জনমনে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ঘটনার পরপরই সাময়িক বরখাস্ত করা হয় ডেপুটি কারারক্ষী মোহাম্মদ আজহারুল ইসলাম ও সর্বপ্রধান কারারক্ষী শাহাদাত হোসেন-কে। এছাড়া বরখাস্ত হওয়া অন্যান্যরা হলেন—
গেট রক্ষী মোরশেদ আলম মুক্তি শাখার গেট রক্ষী মো. হানিফ মিয়া ভর্তি শাখার ইনচার্জ শাহাব উদ্দিন কারাভ্যন্তর গোয়েন্দা রবিউল আলম
আইসিটি শাখার মোহাম্মদ জাহিদ হাসান পিআইডিএস শাখার মোহাম্মদ আবু খায়ের বরখাস্তের ভূতপেক্ষ অনুমোদনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন পাঠানো হয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারের সুপার মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, “ভুলবশত একটি হত্যা মামলার আসামি কারাগার থেকে পালিয়ে গেছে। তাকে গ্রেপ্তারের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালাচ্ছে।”
তিনি আরও জানান, “ঘটনায় ডেপুটি জেলারসহ ৮ জনকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে আরও কারও গাফিলতি বা সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কারাগারের মতো সর্বোচ্চ নিরাপত্তার স্থানে এমন ঘটনা জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। প্রশ্ন উঠেছে— যদি কারাগারই নিরাপদ না থাকে, তবে অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রের সক্ষমতা কতটা?