শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ০৪:০৯ অপরাহ্ন
মোঃ রেজাউল হক রহমত, ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি:
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে মেঘনা নদী যেন একটি উন্মুক্ত খনি। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস সরকারি নিয়মনীতি উপেক্ষা করে কোটি কোটি টাকার বালু উত্তোলন হলেও এতদিন কার্যকর কোনো প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি। অবশেষে বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে চরলাপাং এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালানো হয়। অভিযানে ড্রেজার ও বাল্কহেড জব্দ করা হলেও অবৈধ বালু মহালের মূল হোতারা আবারও রয়ে গেলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
প্রায় ৬ ঘণ্টাব্যাপী এ অভিযানে ২টি ড্রেজার ও ২টি বাল্কহেড জব্দ করা হয় এবং গ্রেপ্তার করা হয় চালক ও শ্রমিকসহ ৫ জনকে। তবে যাদের নির্দেশে, যাদের বিনিয়োগে এবং যাদের রাজনৈতিক-প্রশাসনিক ছত্রছায়ায় মেঘনা থেকে অবৈধ বালু লুট হচ্ছে—সেই প্রভাবশালীদের কেউই অভিযানের আওতায় আসেননি।
কারাগারে শ্রমিক, বহাল তবিয়তে মালিকরা গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা সবাই শ্রমজীবী মানুষ—ড্রেজার চালক, বাল্কহেড চালক কিংবা দিনমজুর। পটুয়াখালী, পিরোজপুর ও ভোলা থেকে আসা এসব শ্রমিকদের ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সর্বনিম্ন ১ মাস থেকে সর্বোচ্চ ৬ মাস পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—যেখানে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার বালু উত্তোলন হয়, সেখানে শ্রমিকরা কি আদৌ সিদ্ধান্তদাতা? নাকি তারা কেবল সিন্ডিকেটের বলি? মেঘনায় অবৈধ খনন: নদী ভাঙছে, গ্রাম যাচ্ছে নদীগর্ভে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানায়, নবীনগর উপজেলার উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের মেঘনা নদীতে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে ইজারার শর্ত লঙ্ঘন করে ভারী ড্রেজার বসিয়ে দিন-রাত অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে।
এতে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তিত হচ্ছে, ভয়াবহ ভাঙনের মুখে পড়ছে চরলাপাংসহ আশপাশের একাধিক গ্রাম। অনেক পরিবার ইতোমধ্যে বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে। তবুও প্রশ্ন থেকেই যায়—এত বড় আকারের অবৈধ কার্যক্রম প্রশাসনের চোখ এড়িয়ে এতদিন কীভাবে চলল? সংবাদ প্রকাশের পরই অভিযান—তাহলে নিয়মিত নজরদারি কোথায়?
গণমাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে সংবাদ প্রকাশের পর জেলা প্রশাসনের নির্দেশে এই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়। অভিযানে নেতৃত্ব দেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রিন্স সরকার ও এম কায়সার। সেনাবাহিনী, জেলা পুলিশ ও নৌপুলিশ সহযোগিতা করে।
কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযানগুলো যেন অনেক সময় “খবরের প্রতিক্রিয়ায়” সীমাবদ্ধ থাকে। নিয়মিত নজরদারি ও গোয়েন্দা তৎপরতা থাকলে অবৈধ ড্রেজার বসানোর আগেই তা বন্ধ করা সম্ভব হতো।
‘অভিযান স্বাগত, কিন্তু নাটক নয়’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রবীণ সাংবাদিক বলেন, “প্রশাসনের অভিযান অবশ্যই দরকার। কিন্তু বছরের পর বছর একই চিত্র—ড্রেজার জব্দ, শ্রমিক গ্রেপ্তার, মালিক অদৃশ্য। এতে সিন্ডিকেট ভাঙে না, বরং আরও শক্তিশালী হয়।”
স্থানীয় বাসিন্দারাও বলছেন, মালিকদের তালিকা প্রশাসনের অজানা নয়। তবুও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া প্রশ্নের জন্ম দেয়।
নির্বাচনের অজুহাত, নাকি সময়ক্ষেপণ? এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক শারমিন আক্তার জাহান গণমাধ্যমকে বলেন,
“এ ধরনের অভিযান চলমান থাকবে। বর্তমানে নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ততা রয়েছে। নির্বাচন শেষে অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে সচেতন মহলের প্রশ্ন—নদী কি নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করবে? ততদিনে মেঘনার কতটা অংশ বিলীন হবে, কত গ্রাম হারাবে তাদের অস্তিত্ব? প্রশ্ন থেকেই যায় অবৈধ বালু উত্তোলনের মূল মালিকরা কারা? তারা কেন বারবার আইনের বাইরে থেকে যাচ্ছে?
প্রশাসনিক ভেতরে কি কোনো নীরব সমঝোতা আছে?
নাকি শ্রমিক শাস্তিই শেষ কথা? মেঘনা নদীর বুকের এই লুটপাট বন্ধ না হলে, একদিন শুধু চরলাপাং নয়—পুরো নবীনগরই পড়বে ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে। এখন দেখার বিষয়, এই অভিযান সত্যিকারের পরিবর্তনের সূচনা নাকি আরেকটি ক্ষণস্থায়ী প্রদর্শনী।