বাংলাদেশ প্রতিদিন খবর
- মঙ্গলবার ৬ জানুয়ারি, ২০২৬ / ৭৪ জন দেখেছে

সোহেল খান দূর্জয় নেত্রকোনা :
শ্রমিক অধ্যুষিত এবং ঘনবসতিপূর্ণ জেলা নেত্রকোনায় ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে মাদকের বিস্তার। ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা, ফেনসিডিল-সব ধরনের মাদক শহর ও আশপাশের গ্রাম এলাকায় সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। শহরের একাধিক চিহ্নিত জায়গা এখন মাদক ব্যবসায়ীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। মাদকের ছড়াছড়ির পাশাপাশি ‘কিশোর গ্যাং’-এর অপরাধমূলক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাত্রাও গত কয়েকমাসে দ্বিগুন বেড়েছে বলে জানিয়েছেন গ্রামাঞ্চলের লোকজন।
কিশোর ও তরুণ বয়সী যুবকরা সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ে একে-অপরের সঙ্গে প্রায়ই সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছেন। গত কয়েকমাসে নেত্রকোনা জেলায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বেশ কয়েকটি ঘটনার নেপথ্যের কারণ মাদক ও কিশোর গ্যাং।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শহরের রাজুর বাজার, সুইপার কলনী, ঢাকা বাস টার্মিনাল- এই তিনটি স্থান বহু আগে থেকেই ‘মাদকের আখড়া’ হিসেবে পরিচিত। এছাড়াও শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে প্রকাশ্যে মাদক কেনাবেচা হয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।আরও জানা যায়, নেত্রকোনা শহরের বেশ কয়েকটি পয়েন্টে সড়কের উপর প্রকাশ্যেই মাদকের বেচাকেনা চলছে।
কেউ এই কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করলে প্রতিকার তো মেলেই না বরং মাদক বিক্রেতাদের রোষানলেও পড়তে হয় বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। মাদকের এই সহজলভ্যতার কারণে সেবনের পাশাপাশি মাদক বিক্রির সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ছেন কিশোর ও তরুণ বয়সীরা।
এই মাদক-সম্পৃক্ততা পরে তাদের কিশোর অপরাধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। স্থানীয়ভাবে আধিপত্য ধরে রাখতে প্রায়শ’ কিশোর গ্যাং-এর সদস্যরা সশস্ত্র মহড়া দেন, প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান। তারা চাঁদাবাজি, ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন।
নেত্রকোনা শহরের স্থানীয় লোকজন বলছেন, মাদক নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে এসব এলাকায় তৈরি হয়েছে কিশোর গ্যাং। এদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে প্রায়ই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। গত কয়েক মাসে স্থানীয়ভাবে আধিপত্য বিস্তার ও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। গ্যাং সদস্যরা সামাজিক অস্থিরতা তৈরির পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নেত্রকোনা শহরের নাম প্রকাশ না করা সর্তে বেশ কয়েকজন স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, আগে এসব জায়গায় মাদক খোলা ঘরে ছাপড়া বানিয়ে বিক্রি হতো। এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বেড়েছে বলে খোলামেলা বিক্রি কিছুটা কমলেও, ব্যবসা একেবারে থেমে যায়নি। বরং সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মাদক ব্যবসায়ীরা নিজের ঘরে মজুদ রেখে গোপনে চালিয়ে যাচ্ছে এই অবৈধ বাণিজ্য। নেত্রকোনা শহরে এখনো ফেনসিডিল, ইয়াবা, হেরোইন ও গাঁজা সহজেই পাওয়া যায়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে কিছু মাদক উদ্ধার ও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করলেও, চক্র ভেঙে পড়েনি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় একাধিক সূত্র। বরং মাদক ব্যবসায়ীরা বরাবরই রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় পাচ্ছেন।
নেত্রকোনা শহরের স্থানীয় লোকজন বলছেন, বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অস্থিরতায় মাদকের বিস্তার আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পুরনো মাদক ব্যবসায়ী চক্রগুলো আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছে।এদিকে নেত্রকোনা জেলা পুলিশ সুপার মোঃ তরিকুল ইসলাম একাধিক সময়ে বলেছেন, মাদকের ব্যাপারে জেলা পুলিশ ‘জিরো টলারেন্স’ ভূমিকায়।
মাদকের বিভিন্ন চিহ্নিত স্পটে ইতোমধ্যে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধারও করা হয়েছে। মাদক নির্মূলে প্রতিনিয়ত কাজ করছে পুলিশ। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়,নেত্রকোনা জেলার কয়েকটি স্থানে ইতোমধ্যে যৌথ বাহিনী ও পুলিশের অভিযান চালানো হয়েছে। এসব জায়গা থেকে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার করা হয়েছে। মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।
এমনকি মাদকের ‘হটস্পট গুলোতে’ও নিয়মিত অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।তবে, নেত্রকোনার সচেতন নাগরিক সমাজের লোকজন বলছেন, মাদক ও কিশোর গ্যাং নির্মূলে প্রশাসনের ভূমিকা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। বিশেষ করে এই ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে রাজনৈতিক প্রশ্রয় বন্ধেরও দাবি জানান তারা।