শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ১১:২৯ পূর্বাহ্ন

মো. সেলিম উদ্দিন খাঁন
এম এ মোতালেব সিআইপি তার নাম,তার মালিকানাধীন বনফুল ও কিষোয়ান (মিষ্টি ও বেকারি পণ্য উৎপাদন করে প্রতিষ্ঠানগুলো) গ্রুপের মাধ্যমেই ব্যবসায়ীদের দেওয়া রাষ্ট্রের এই সর্বোচ্চ খেতাবটি নিজের দখলে নিয়েছেন তিনি। এছাড়াও তার নামের পাশে যুক্ত হয়েছে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান। কারণ ২০১৯ সালে জামায়াতবিহীন চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন ঈগল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম এ মোতালেব সিআইপি। ঈগল প্রতীকে তিনি ৮৫ হাজার ৯৫৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী ড. আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামউদ্দিন নদভী পেয়েছেন ৩৯ হাজার ২৬৫ ভোট।এদিকে আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক বনেছেন মোতালেব।
নামে-বেনামে দেশে-বিদেশে গড়ে তুলেছেন হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি। শতশত অভিযোগ রয়েছে এই মোতালেবের বিরুদ্ধে। ইতিমধ্যে সামনে এসেছে দুবাইয়ে তার দুইশ বাড়ির বিষয়টি নিয়ে এখন আলোচনায়। এদিকে মোতালেবের বিরুদ্ধে ৫০০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পত্তির সন্ধান পেয়েছে গোয়েন্দা সংস্থা। সংস্থার উর্ধŸতন এক কর্মকর্তা প্রতিদিনের কাগজ’কে জানান, মোতালেবের আয়কর নথিতে উল্লেখ নেই এমন ৫০০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পত্তির সন্ধান মিলেছে। বিষটি তদন্তনাধীন থাকায় এর চেয়ে বেশি বলতে চাননি উক্ত কর্মকর্তা। এদিকে জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার কারণে ২০২৩ সালে মোতালেব চাকুরিচ্যুত করেছিলেন বনফুল গ্রুপের মুরাদপুর শাখার সুপারভাইজার মো. শাহাদাত হোসেন মুরাদকে।
বিষয়টি জানাজানি হলে সারাদেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এদিকে বার বার স্বচ্ছতার দোহাই দিয়ে ব্যবস্যা করলেও বনফুল-কিষোয়ান ৩ কোটি টাকার ভ্যাট মেরে মামলা খেয়েছেন মোতালেব। এই দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নয় কোটি টাকারও বেশি বিক্রির তথ্য গোপনের থাকার বিষয়টি উদঘাটন করেছে সরকারি সংস্থাটি। এদিকে প্রতিদিনের কাগজের অনুসন্ধানী টিম সারাদেশে বনফুল-কিষোয়ান ডিপো-ডিলারদের সাথে কথা বলে ভয়াবহ তথ্য উঠে আসে। এক ডিলার জানান, আমাদের বিক্রির সেল সব চাইতে বাজারে বেশি। ভ্যাট ফাঁকির বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় মঙ্গলবার (১২ এপ্রিল) বনফুল এন্ড কোম্পানি ও কিষোয়ান স্ন্যাকসের বিরুদ্ধে পৃথক পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর আগে গত ১৭ জানুয়ারি ভ্যাট গোয়েন্দা অধিদফতরের একটি টিম বনফুল এন্ড কোম্পানি ও কিষোয়ান স্ন্যাকসের কুমিল্লার দুটি কার্যালয়ে অভিযান চালায়। দুটি প্রতিষ্ঠান থেকে ওই টিম ভ্যাট ফাঁকির আলামত হিসেবে বিক্রয় চালান ও বিক্রয় রেজিস্টারসহ কয়েকটি কম্পিউটার জব্দ করে। ভ্যাট গোয়েন্দার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বনফুল এন্ড কোম্পানি ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের হিসাব বিবরণীতে বিক্রির পরিমাণ দেখা গেছে ৬ কোটি ৫০ লাখ ৯০ হাজার ৬৫৪ টাকা। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির ওই শাখায় কৌশলে ৩ কোটি ১৯ লাখ ৬২ হাজার ২৯ টাকার পণ্য বিক্রির তথ্য গোপন করা হয়েছে। এই বিক্রির ওপর ভ্যাট এসেছে ৪১ লাখ ৬৮ হাজার ৯৬০ টাকা। এই ভ্যাট যথাসময়ে পরিশোধ না করায় ভ্যাট আইন অনুযায়ী মাসিক ২ শতাংশ হারে সুদ হিসেবে প্রাপ্য আরও ২ লাখ ৮৩ হাজার ৭১৬ টাকা। অন্যদিকে কিষোয়ান স্ন্যাকস ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫ কোটি ৮২ লাখ ৮৮ হাজার ৮৩৪ টাকার পণ্য বিক্রির তথ্য গোপন করেছে।এই বিক্রির ওপর ভ্যাট এসেছে ১ কোটি ৬১ লাখ ২৩ হাজার ৩৭৬ টাকা। এর বাইরে সুদ হিসেবে প্রাপ্য আরও ৯৭ লাখ ২৯ হাজার ৩৩৭ টাকা। সবমিলিয়ে বনফুল ও কিষোয়ানের বিরুদ্ধে মোট ৯ কোটি ২ লাখ ৫০ হাজার ৮৬৩ টাকার পণ্য বিক্রির তথ্য গোপন করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনেছে ভ্যাট গোয়েন্দা অধিদফতর। তিনি বিএনপি-জামায়াত নেতাদের উপর নির্যাতনের বুল ডোজার চালান। লোহাগাড়া থানায় মামলা করেন মো. ফারুকুল ইসলাম (৩৬) নামের এক ব্যক্তি। বাদী ফারুকুল লোহাগাড়া থানার আধুনগর ইউনিয়নের নূর হোসেন চকিদারপাড়া এলাকার আবুল হাশেমে ছেলে। মামলায় এম এ মোতালেব বাদেও আরও ২৪৭ জনকে এজাহারনামীয় এবং অজ্ঞাতপরিচয় ১৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। লোহাগাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল জলিল মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, অভিযোগ পেয়ে মামলা নেওয়া হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে আসামিদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। মামলার এজাহারে বলা হয়, গত ২০ জুলাই দুপুরে লোহাগাড়া উপজেলা পরিষদের সামনে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীদের অবস্থান কর্মসূচি ছিল। ওই অবস্থান কর্মসূচিতে (তৎকালীন) এমপি এম এ মোতালেবের নির্দেশে আসামিরা আগ্নেয়াস্ত্র, ককটেল ও পেট্রোলবোমা নিয়ে হামলা চালান। এসময় বাদীসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। এই বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য তাকে বেশ কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেনি। বনফুল গ্রুপের একাধিক শাখায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, মোতালেবের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, কর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং প্রতিষ্ঠানীয় নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগ রয়েছে। একাধিক কর্মী জানিয়েছেন, তাদের বেতন সময়মতো পরিশোধ করা হয়নি, বরং বিভিন্ন অজুহাতে কাটছাঁট করা হয়েছে। এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে মোতালেবকে বেশ কয়েকবার ফোন করা হয়। তিনি রিসিভ করেনি।