বাংলাদেশ প্রতিদিন খবর
- বৃহস্পতিবার ৮ জানুয়ারি, ২০২৬ / ৯৪ জন দেখেছে

সোহেল খান দুর্জয় নেত্রকোনা :
প্রাচীন কোচ রাজার ঐতিহ্যমণ্ডিত নদীঘেরা ছায়াঢাকা, সুশীতল মদন কোচ শাসিত অঞ্চলে ১০৫৩ সালের কিছু আগে ইসলামের ঝাণ্ডা হাতে সুফি সাধক হযরত শাহ সুলতান কমর উদ্দিন রুমী (রাহ:)-এর আগমন ঘটে। পশ্চিম এশিয়ার সেলজুক রাজবংশের তুরস্ক সুলতানের সহোদর হযরত শাহ সুলতান কমর উদ্দিন রুমী (রাহ:) জাতিতে ছিলেন তুর্কি।
উল্লেখ্য যে রোম (ইতালি) সাম্রাজ্য বিজয়ী তুরস্ক রাজ্যকেই অন্য নামে রোম সাম্রাজ্য বলা হতো এবং শাসকদের বলা হতো রুমি। সুলতানের কনিষ্ঠ ভ্রাতা হিসেবে তাকেও শাহ সুলতান উপাধিতে অভিহিত করা হয়। হযরত শাহ সুলতান কমর উদ্দিন রুমী (রাহ:) ১২০ জন সুফি সাধকের সংঘবদ্ধ দল নিয়ে বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূল চট্টগ্রামে প্রথম পদার্পণ করেন। সেখান থেকে ১২০ জনের ওই আউলিয়ার দলটি ধর্ম প্রচারের জন্য বেশ কয়টি ভাগে বিভক্ত হয়ে একটি দল পাণ্ডুয়ার রাজধানী মহাস্থানগড় (বগুড়া) অভিমুখে রওনা হন এবং সেখানকার প্রভাবশালী রাজা পরশুরামকে ইসলামের দাওয়াত দেন। সে দাওয়াত পেয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে পরশুরাম সম্মুখযুদ্ধে লিপ্ত হয়।
অতর্কিত এ যুদ্ধে ১২০ জনের দাওয়াতি দলের সেনাপতি হযরত শাহ সুলতান সৈয়দ মাহমুদ মাহিসোয়ারসহ শাহ কাবিল গাজী, হটিয়া গাজী, শাহ এরফান গাজী, শাহ মাসউদ গাজী, শাহ মিঞা গাজী, শাহ ফাররুখ এই সাতজন বীর আউলিয়া শহীদ হন। এই সেনাপতি হযরত শাহ সুলতান সৈয়দ মাহমুদ মাহিসোয়ারেরই সমাধি বগুড়ার মহাস্থানের হযরত শাহ সুলতানের মাজার নামে পরিচিত।
হযরত শাহ সুলতান সৈয়দ মাহমুদ মাহিসোয়ারের শহীদ হওয়ার সংবাদ পেয়ে হযরত শাহ সুলতান কমর উদ্দিন রুমী অন্যত্র ইসলামের প্রচারকাজ সাময়িক স্থগিত ঘোষণা করে তার বাহিনী অর্থাৎ কায়কাউস নামে আউলিয়া দল নিয়ে মহাস্থানে গমন করেন। তিনি সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত না হয়ে পরশুরামকে প্রস্তাব পাঠান যে মিথ্যা পৌত্তলিকতাবাদকে ছেড়ে কুসংস্কারের অন্ধকার ভেদ করে আল্লাহর একত্ববাদ ও তার প্রেরিত পুরুষ হযরত মোহাম্মদ (সা.)-কে মেনে নিতে। এতে বিজয় উল্লাসে থাকা রাজা পরশুরাম ক্ষেপে গিয়ে প্রেরিত দূত হযরত তাপস মল্লিককে বন্দি করে ফেলে। অনন্যোপায় হযরত শাহ সুলতান কমর উদ্দিন রুমী (রাহ:) রণপ্রস্তুতি নিতে বাধ্য হয়ে রাজা পরশুরামকে আক্রমণ করে তাকে পরাজিত ও নিহত করে সব বরেন্দ্রভূমি দখল করেন। এরই মধ্যে জয় করা এলাকাগুলোর বেশির ভাগ লোক দলে দলে ইসলামের পতাকাতলে সমবেত হতে থাকে। পরশুরামকে হত্যার ফলে বরেন্দ্রভূমি হাতে এলে সেখান থেকে যুমনা নদী পাড়ি দিয়ে বরেন্দ্র এলাকার পুব দিকে সুশিক্ষিত কায়কাউস নামক বাহিনী নিয়ে রওনা হন এবং জামালপুরের (বর্তমান) দুর্মুট নামক জায়গায় আস্তানা স্থাপন করেন। সেখানে ধর্মীয় প্রচারাভিযান নির্বিঘ্নে চালনা শেষে সেখান থেকেই ১৩ (তেরো) জন আউলিয়ার একটি বাহিনী আবার বরেন্দ্রভূমির মহাস্থানের দিকে পাঠান। হযরত শাহ সুলতান কমর উদ্দিন রুমী (রাহ:) দুই আউলিয়ার ওপর দুর্মুটের দায়িত্ব দিয়ে তার শিক্ষাগুরু সৈয়দ মহীউদ্দিন সুর্খুল আম্বিয়া সুরতনী (রাহ:)সহ ৪০ জনের কায়কাউস বাহিনী নিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের পুবপাশে কামরূপ এলাকার ছোট ছোট পৌত্তলিক ধর্মাশ্রয়ী সামন্ত রাজাদের এলাকা জয় ও ইসলামের প্রচারকাজ সিদ্ধির জন্য এগিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের পশ্চিম তীরের বালুর চরে এসে মাগরিবের নামাজ আদায় করেন।
বোকাই নগর থেকে কায়কাউস বাহিনী মদন কোচের রাজ্যাভিমুখে যাত্রা করেন; মদন কোচ আগে থেকেই এ কায়কাউস বাহিনীর যুদ্ধ কাহিনী ও রাজা পরশুরামের পরাজয়ের কথা জানতে পায়। যখন শুনতে পায় ব্রহ্মপুত্রের পশ্চিমাংশ থেকে কায়কাউস বাহিনী বিভক্ত হয়ে মাত্র কয়েকজনের এক বাহিনী আসছে, তখন মদনকোচ অনেকটা আশ্বস্ত হয়।
সে খতিয়ে দেখেনি যে কায়কাউস বাহিনীর রণদক্ষ ব্যক্তিরাই এ ফকির বেশে আসছে। হযরত শাহ সুলতান কমর উদ্দিন রুমী (রাহ:) রাজা মদনকোচের রাজদরবারে না গিয়ে দামছাপুর (নন্দিপুর) গ্রামে প্রথম আস্তানা গড়েন। কিছুদিন অবস্থানের পর কাংসার ঘাট (সৈয়দ ফজল) নামক স্থানে আস্তানা স্থাপন করেন।
শেষে এ কোচ রাজ্যের রাজধানীর পশ্চিমে ঝিটাই নদীর দক্ষিণ তীরে বিনাবাধায় প্রবেশ করে নামাজ আদায় করেন ও ধ্যানমগ্ন শেষে বলেন যে, ‘এখানেই আমার হয়তো শেষ পর্যায়। অর্থাৎ মদনকোচের রাজ্যের অভিযানই শেষ অভিযান।’ যে জায়গায় হযরত শাহ সুলতান কমর উদ্দিন রুমী (রাহ:) নামাজ আদায় করেছিলেন, সে জায়গা কোনো শর্ত ছাড়া তাদের দান করার প্রস্তাব দিয়ে অনুগত রূপস মল্লিককে মদনকোচের রাজদরবারে দূত হিসেবে পাঠান।
রাজদরবারে প্রস্তাবটি তুললে প্রথমবারে তার বোন নন্দিনী মানব বলিদানের ভয় দেখিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেন। দ্বিতীয়বার যখন একটি জায়নামাজের সমপরিমাণ স্থানের আবেদন করা হয়, তখন তুচ্ছজ্ঞানে মঞ্জুর করেন। তার পরই মদনকোচের মনে সন্দেহ দেখা দেয়। সে চিন্তা করল বিদেশীরা নিশ্চয় গুপ্তধনের খোঁজ পেয়েছে।
সে মুহূর্তেই সৈন্যবাহিনী নিয়ে হাজির হলো দান করা জায়গায়। তখন হযরত শাহ সুলতান কমর উদ্দিন রুমী (রাহ:) আসরের নামাজ আদায় করছিলেন। নামাজ শেষ হলে মদনকোচ তার সৈন্যদলের সদস্যদের জায়নামাজের নিচের স্থান খনন করার আদেশ দিলেন, কিন্তু কোনো ধনের খোঁজ পাওয়া গেল না।