
একই পদে প্রায় ৮ বছর, ফাইল আটকে রাখা ও অর্থ দাবির অভিযোগ; সরকারি কোয়ার্টার ও মোটরসাইকেল নিয়েও প্রশ্ন
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিবহন বিভাগের শিপিং শাখায় কর্মরত উচ্চমান সহকারী মো. আরিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ঘুষ দাবি, ফাইল আটকে রাখা, ক্ষমতার অপব্যবহারসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। একই শাখায় একই পদে প্রায় আট বছর ধরে দায়িত্ব পালন করায় তার দীর্ঘদিনের অবস্থান ও প্রশাসনিক প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি।
শিপিং এজেন্টদের কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, বিভিন্ন আবেদন ও নথিপত্র প্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রে আরিফ মাহমুদ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে অর্থ দাবি করেন। অভিযোগ রয়েছে, দাবিকৃত অর্থ দিতে অনাগ্রহ দেখালে সংশ্লিষ্ট ফাইল দীর্ঘদিন আটকে রাখা হয়। এতে ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি অনেকেই অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য হন বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিপিং এজেন্ট কর্মকর্তা বলেন, “টাকা না দিলে ফাইল মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়। ফলে অনেকে বাধ্য হয়ে বাড়তি টাকা দেওয়ার চেষ্টা করেন।”
‘কালু শাহ এন্টারপ্রাইজ’ নিয়ে প্রশ্ন
আরিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের মধ্যে আলোচনায় এসেছে ‘কালু শাহ এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানও।
অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তৎকালীন চট্টগ্রাম-১১ আসনের সংসদ সদস্য এমএ লতিফের ঘনিষ্ঠ হিসেবে আরিফ মাহমুদের পরিচিতি ছিল। একই সময়ে তৎকালীন সিবিএ সাধারণ সম্পাদক নায়েবুল ইসলাম ফটিকের প্রভাব কাজে লাগিয়ে তার ভাইয়ের নামে ‘কালু শাহ এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি ভেন্ডর লাইসেন্স অনুমোদন করানোর অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ওই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ করা শিপিং এজেন্টদের ফাইল তুলনামূলক দ্রুত নিষ্পত্তি করা হতো। বিপরীতে, অন্য ভেন্ডরের মাধ্যমে কাজ করা এজেন্টদের ফাইল দীর্ঘ সময় আটকে রাখার অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আরিফ মাহমুদ তা অস্বীকার করে বলেন, “এটি আমার না, আমার ভাইয়েরও না।”
তবে প্রতিবেদকের হাতে থাকা তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স তার আপন ভাইয়ের নামে রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত মালিকানা, লাইসেন্সের আবেদনকারী এবং অনুমোদনের প্রক্রিয়া জানতে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বরাদ্দ দেওয়া আগ্রাবাদের ডেবার পাড় এলাকার জে-১১৬/বি নম্বর সরকারি বাসা নিয়েও অভিযোগ উঠেছে আরিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারীদের দাবি, বরাদ্দ পাওয়া সরকারি বাসাটি অন্য ব্যক্তির কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। অথচ সেখানে সরকারি বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ বিভিন্ন সুবিধা ব্যবহৃত হচ্ছে।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, আরিফ মাহমুদ নিজে নগরীর ছোটপুল এলাকায় একটি নিজস্ব ফ্ল্যাটে বসবাস করেন।
সরকারি কোয়ার্টার ভাড়া দেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বন্দরে অনেকে বাসা ভাড়া দিয়েছে। শুধু কি আমারটা দেখলেন?”
তবে তিনি নিজে সরকারি বাসাটি অন্যের কাছে ভাড়া দিয়েছেন কি না—এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো জবাব দেননি।
এ ক্ষেত্রে বাসাটি বরাদ্দের শর্ত, সেখানে প্রকৃতপক্ষে কে বসবাস করছেন এবং বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ সরকারি সুবিধা কারা ব্যবহার করছেন—এসব তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথি ও সরেজমিন যাচাইয়ের দাবি রাখে।
আরিফ মাহমুদের ব্যবহারের জন্য বরাদ্দকৃত মোটরসাইকেল নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন সহকর্মী।
তাদের দাবি, আরিফ মাহমুদকে নিয়মিত মোটরসাইকেল ব্যবহার করতে দেখা যায় না। অথচ মোটরসাইকেলটির জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ নিয়মিত অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে আরিফ মাহমুদ বলেন, “আমি নিজেই চালাই, তবে প্রায় সময়ই এটি নষ্ট থাকে।” পরে তিনি জানান, মোটরসাইকেলটি নষ্ট হয়ে পড়ে আছে।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, মোটরসাইকেলটির জ্বালানি ও মেরামত বাবদ নিয়মিত অর্থ উত্তোলন করা হচ্ছে।
অভিযোগটি সত্য কি না তা নিশ্চিত করতে মোটরসাইকেলটির লগবুক, জ্বালানি গ্রহণের হিসাব, মেরামতের বিল, ওয়ার্কশপের নথি এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনুমোদন যাচাই করা প্রয়োজন।
এক ভুক্তভোগীর সঙ্গে অর্থ চাওয়ার বিষয়ে আরিফ মাহমুদের কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে বলে জানা গেছে।
অডিওটির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা না দিয়ে বলেন, “এ বিষয়ে কিছু করতে পারলে করেন।” এরপর ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।
লাইসেন্স নবায়নের সময় ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “এটি আমার দপ্তরে রিনিউ হয় না।”
অডিও রেকর্ডটির উৎস, সম্পাদনা করা হয়েছে কি না এবং কথোপকথনের প্রেক্ষাপট স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুযায়ী, যাচাই ছাড়া কোনো অডিওকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা সমীচীন নয়।
নথি ও সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সাল থেকে একই শাখায় একই পদে দায়িত্ব পালন করছেন মো. আরিফ মাহমুদ।
দীর্ঘ সময় একই শাখায় অবস্থানের কারণে তার প্রশাসনিক প্রভাব ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের যোগাযোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন একাধিক কর্মকর্তা।
তাদের দাবি, বন্দর কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন সময়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি হলেও আরিফ মাহমুদ একই শাখায় বহাল রয়েছেন। সম্প্রতি পুরোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি সংক্রান্ত আদেশ জারি হলেও তাতে তার নাম না থাকায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে আরিফ মাহমুদ বলেন, “আমি এখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য অনেক চেষ্টা করছি। বন্দর কর্তৃপক্ষ আমাকে সরাচ্ছে না।”
ফলে একই পদে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বন্দর কর্তৃপক্ষের বদলি নীতিমালা কী এবং তার ক্ষেত্রে সেটি কীভাবে প্রয়োগ হয়েছে—তা যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, ৫ আগস্টের পর আরিফ মাহমুদ নিজেকে বিএনপির নির্যাতিত নেতা হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন। বর্তমানে সাধারণ কর্মচারীদের বদলির ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
তবে এই অভিযোগগুলোর বিষয়ে আরিফ মাহমুদের বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের বক্তব্য, বদলির আদেশ এবং আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
মোটরসাইকেল সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রশাসন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বিষয়টি ট্রাফিক সেকশনের আওতাধীন।
এ বিষয়ে ট্রাফিক সেকশনের পরিচালকের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
মো. আরিফ মাহমুদ ঘুষ দাবি, সরকারি বাসা ভাড়া দেওয়া এবং মোটরসাইকেল সংক্রান্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ‘কালু শাহ এন্টারপ্রাইজ’ তার কিংবা তার ভাইয়ের নয় বলেও দাবি করেছেন তিনি।
তবে অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্যতা নির্ধারণে মৌখিক বক্তব্যের পাশাপাশি সরকারি নথি যাচাই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে—
‘কালু শাহ এন্টারপ্রাইজ’-এর ভেন্ডর লাইসেন্স কার নামে ও কীভাবে অনুমোদিত হয়েছে।
আরিফ মাহমুদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে কি না।
সরকারি কোয়ার্টার জে-১১৬/বি বর্তমানে কে ব্যবহার করছেন।
বাসা বরাদ্দের শর্ত ভঙ্গ হয়েছে কি না।
মোটরসাইকেলের জ্বালানি ও মেরামতের অর্থ কীভাবে উত্তোলন হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট মোটরসাইকেলের লগবুক ও রক্ষণাবেক্ষণ নথি কী বলছে ২০১৮ সাল থেকে একই শাখায় দায়িত্ব পালনের প্রশাসনিক অনুমোদন ও বদলি-সংক্রান্ত নথি কী বলছে;
অভিযোগকৃত অর্থ লেনদেনের কোনো স্বাধীন প্রমাণ রয়েছে কি না—
এসব প্রশ্নের উত্তর সরকারি নথি ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্যের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
অভিযোগের বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রতিবেদনে সংযোজন করা হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: বিল্লাল হোসেন
www.e.bdprotidinkhabor.com
Copyright © 2026 বাংলাদেশ প্রতিদিন খবর. All rights reserved.