
প্রিন্ট এর তারিখঃ মে ৪, ২০২৬, ৩:০৭ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ মে ৩, ২০২৬, ১১:০৫ অপরাহ্ণ
নেত্রকোনার হাওর পাড়ের কৃষকদের আর্তনাদ

সোহেল খান দূর্জয়- নেত্রকোনা :
নেত্রকোনায় কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি শেষে দুই দিন স্বস্তি মিলেছিল হাওরাঞ্চলে। হালকা রোদ উঠেছিল। শনিবার ভোর থেকেই আবার আকাশ মেঘে ঢেকে যায়। দুপুরের পর নামে বৃষ্টি, সঙ্গে বজ্রপাত। উজান থেকে নামা পাহাড়ি ঢলের পানির সঙ্গে মিলে এই বৃষ্টি হাওরপারের কৃষকদের অনিশ্চয়তায় ফেলেছে। জেলার খালিয়াজুরি, মোহনগঞ্জ, মদন, কলমাকান্দা, বারহাট্টা, আটপাড়া, কেন্দুয়াসহ বিস্তীর্ণ হাওর এলাকায় পাকা বোরো ধান এখন পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
কোথাও কোথাও ধান কাটার কাজ চললেও বৃষ্টিতে পানি আরও বাড়ায় সেই কাজ থমকে গেছে। খালিয়াজুরি উপজেলার হায়াতপুর গ্রামের কৃষক দুলাল চন্দ্র সরকার বলেন, ‘হাতে কিছু টাকা আছিল আর ধারদেনা কইরা চার একর বোরো ধান লাগাইছিলাম। ধান পাকতে শুরু করছিল। এইবায় একটানা বৃষ্টি হইব, ভাবছিলাম না। বৃষ্টির পানির জন্য সব খেতে ধান তল হয়ে গেছে। দেড় হাজার টেকা রোজ দিয়াও কামলা পাইছি না। বউ–বাচ্চা লইয়া পানিত নাইম্মা মাত্র ৮০ শতাংশ খেতে ধান কাটছি। আর সব ধান পানির নিচে। কাটা ধানও শুকাইতে পারতাছি না। ভিজা ধানে অহন জালা (অঙ্কুর) বাইরসে। আবুদুব (সন্তান) লইয়া কীবার চলবাম, কিছুই বুঝতাছি না। অহন পথে বওন ছাড়া আর কিছু উপায় নাই।’
এদিকে শুক্রবার বিকেলে বারহাট্টা উপজেলার মনাস গ্রামের কলাভাঙ্গা হাওরে গিয়ে দেখা যায়, খেতের সব ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। শ্রমিক না পেয়ে বাধ্য হয়ে কৃষকেরা নিজেরাই পানিতে নেমে ধান কাটছেন। কেউ কেউ ছোট নৌকায় করে কাটা ধান পাড়ে আনছেন। কেউ ভেজা ধান ও খড় সড়কে শুকাতে দিচ্ছেন, কেউ মাড়াই করছেন। এ সময় সেখানে নেত্রকোনা-২ (সদর-বারহাট্টা) আসনের সংসদ সদস্য মো. আনোয়ারুল হক সেখানে যান। তাঁকে পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা বিভিন্ন দাবি জানান।
এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী কৃষকদের সহযোগিতার আশ্বাস দেন। মনাস গ্রামের কৃষক মনজুরুল হক বলেন, ‘আমি ২০ হাজার টেহা সুদে আইন্যা কলাভাঙ্গা বিলে ১০ কাঠা (১০০ শতক) জমি লাগাইছিলাম। এক মুইঠ ধানও ঘরো তুলতে পারছি না। দিনে রাইতে বৃষ্টির পানি বাইরা চোক্ষের সামনে ধান ডুইব্বা গেছে। অহন দেনা পরিশোধ কিবায় করবাম আর পরিবার লইয়া কীবায় চলবাম? কোনো পথ পাইতাছি না।’মদন উপজেলার বাগজান গ্রামের কৃষক ফয়েজ আহমেদ বলেন, ‘পানি কমার কোনো লক্ষণ নাই।
যে খেতে ধানের আগা একটু ভাইসা আছে, তা কাডনের লাইগ্গা দেড় হাজার টেহা দিয়াও শ্রমিক পাওয়া যাইতাছে না। আর অত টেহা দিয়া কাটাইলেও কোনো লাভ হতো না। কাটলেও লস, না কাটলেও লস। চোক্ষের সামনে এই ক্ষতি আর সহ্য হয় না।’
অন্যদিকে কলমাকান্দা উপজেলার বড়খাপন গ্রামের কৃষক রুবেল তালুকদার বলেন, ‘ধান কাটতে গেলে একজন শ্রমিকের মজুরি দেড় হাজার টাকা দিতে হয়। এর সঙ্গে কাটা ধান শুকনা জায়গায় আনতে নৌকা ভাড়া দিতে হয়। তারপর বাড়িতে এনে মাড়াই করতে আরও টাকা খরচ পড়ে। সব মিলিয়ে লস ছাড়া কোনো লাভ নাই। গুড়াডোবা হাওরে আমার ৯ একর জমির ধান পানির নিচে।’জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কার্যালয় জানায়, জেলায় ১ লাখ ৮৬ হাজার হেক্টর খেতে বোরো আবাদ করা হয়।
উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে হাওরে ৪২ হাজার হেক্টর খেতে বোরো আবাদ হয়। সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত ১৩ হাজার ৪৬৬ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। তবে স্থানীয় লোকজনের দাবি, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ এর দ্বিগুণ। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম জানান, পানি আরও বাড়লে ক্ষতির পরিমাণ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নেত্রকোনার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, কংস নদের পানি জারিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ১ দশমিক ৩ মিটার ও উব্দাখালী নদীর কলমাকান্দা পয়েন্টে বিপৎসীমার ৭৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে এখনো কোনো ফসল রক্ষা বাঁধ ভাঙেনি। বৃষ্টির পানিতে ধানের ক্ষতি হচ্ছে। দ্রুত ধান কেটে ফেলাই এখন সবচেয়ে নিরাপদ।
নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে। মাঠপর্যায়ে প্রশাসনের কর্মকর্তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। নেত্রকোনা-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. আনোয়ারুল হক ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে বলেন, কৃষকের অনেক ক্ষতি হয়েছে। তাঁদের পাশে দাঁড়াতে সরকার সব ধরনের সহায়তা দেবে। খালিয়াজুরি এলাকার বাসিন্দা ও হাওর গবেষক সঞ্জয় সরকার জানান, হাওর নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে পরিকল্পনা না করে টেকসই ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা প্রয়োজন।
এখন বৃষ্টি বা হাওরে পানি আসবে—এটাই স্বাভাবিক। অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে বৃষ্টির পানি যেতে পারছে না। পানি যাওয়ার পথগুলো পলি জমে বন্ধ হয়ে গেছে। হাওরের অধিকাংশ জলকপাট (স্লুইসগেট) অকেজো হয়ে রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে পানিতে যে বোরো ধান নিমজ্জিত হয়েছে, তা পাহাড়ি ঢল বা বন্যার পানি নয়, বৃষ্টির পানি। সে জন্য হাওরের তলদেশ খনন করা যেতে পারে। হাওর এলাকায় ধান শুকানোর জন্য যন্ত্র স্থাপন করলে দুর্ভোগ কমবে। এ ছাড়া কৃষকেরা অধিক ফলনের আশায় দীর্ঘমেয়াদি ধান (জীবনকাল ১৪৫ থেকে ১৪৮ দিন) রোপণ করেন। যেসব ধানের জীবনকাল ১৪০ দিন পর্যন্ত, সেসব ধান লাগানোর জন্য কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা প্রয়োজন, যাতে দ্রুত ধান কেটে ফেলা যায়।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: বিল্লাল হোসেন
www.e.bdprotidinkhabor.com
Copyright © 2026 বাংলাদেশ প্রতিদিন খবর. All rights reserved.