মো. সেলিম উদ্দিন খাঁন
পার্বত্য বান্দরবান জেলার লামা উপজেলাধীন ফাইতং ইউনিয়ন অবৈধ ইটভাটার নগরী হিসেবে পরিচিত। পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো বৈধ ছাড়পত্র ছাড়াই ইউনিয়নের মাত্র তিনটি ওয়ার্ডে গড়ে উঠেছে অন্তত ৩১টি ইটভাটা। বছরের পর বছর ধরে চাষযোগ্য জমি, পাহাড় ও বনাঞ্চল ধ্বংস করে চললেও কার্যকর বন্ধের নজির নেই বললেই চলে।অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ফাইতং ইউনিয়নে ৭ নম্বর ওয়ার্ডের শিবাতলীপাড়া,মংবাচিংপাড়া ও মে অংপাড়া এলাকায় রয়েছে ৯টি ইটভাটা।
৮ নম্বর ওয়ার্ডের লাম্বাশিয়া, বড়খোলা ও পুরোনো হেডম্যানপাড়ায় রয়েছে ১৫টি ইটভাটা। ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মানিকপুর এলাকায় গড়ে উঠেছে ৭টি ইটভাটা।এই তিন ওয়ার্ডেই ভাটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩১টিতে, যেগুলোর অধিকাংশই পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। সরেজমিনে দেখা যায়, ভাটার আশপাশে পাহাড় কেটে মাটি সংগ্রহ করা হচ্ছে নির্বিঘ্নে। বহু জায়গায় বনাঞ্চল উজাড় করে স্থাপন করা হয়েছে ইটভাটা। ফসলি জমি হারিয়ে স্থানীয় কৃষকরা পড়েছেন চরম সংকটে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এক সময় যেখানে ধান ও সবজি চাষ হতো, সেখানে এখন শুধু কালো ছাই, ধোঁয়া আর ধুলাবালি। বর্ষা মৌসুমে সাময়িকভাবে সবুজের আড়াল তৈরি হলেও বাস্তবে মাটির উর্বরতা প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। আইন অনুযায়ী বসতবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সড়কের নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন নিষিদ্ধ।
অথচ ফাইতং ইউনিয়নে দেখা গেছে— স্কুলের পাশেই ইটভাটা,জনবসতির মাঝখানে চিমনি খাল ও সড়কের একেবারে গা ঘেঁষে ভাটা। এর ফলে শিশু, নারী ও বয়স্করা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছেন। সূত্র বলছে,ফাইতং ইউনিয়নের মোট জমির পরিমাণ প্রায় ১৬ হাজার ২০৫ একর।
এর মধ্যে শুধু ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডে রয়েছে ৫ হাজার ৪০১ একর জমি। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই তিন ওয়ার্ডের প্রায় ১০ ভাগের ১ ভাগ জমি দখল করে রেখেছে ৩১টি ইটভাটা। বর্তমানে এসব এলাকায় চাষাবাদের মতো পর্যাপ্ত জমি আর অবশিষ্ট নেই।
গত (২০ নভেম্বর) ২০২৫ ইং, পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রেজওয়ান উল ইসলাম ও পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক মো. জমির উদ্দিন'র নেতৃত্ব সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ ও বিজিবি সদস্যদের নিয়ে লামা উপজেলার ফাইতং এলাকায় ইটভাটায় অভিযানে যাওয়ায় পথে চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নের বাদশারটেক এলাকায় ইট ভাটা মালিকদের ইশারায় শ্রমিকরা ব্যারিকেড় দেয়। তারা সড়কে ইট ভাঙ্গা ও পিকআপ যানবাহন রেখে সড়ক অবরোধ করে রাখে। এসময় ইট ভাটা মালিক ও শ্রমিকরা অভিযানের বিপক্ষে স্লোগান দিয়ে অবস্থান করে।
এ সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ব্যারিকেড় ভেঙে যেতে চাইলে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এসময় উভয়পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হয়। একটি বিজিবির জীপ গাড়ি, র্যাবের একটি ও স্কেভেটর বহনকারী ট্রাক ভাংচুর করে উত্তেজিত জনতা। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ৮ শ্রমিককে আটক করে।গত (২৫ ডিসেম্বর) ২০২৫ ইং,সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ মঈন উদ্দিন অভিযান পরিচালনা করে ফাইতং ইউনিয়নে মেসার্স এমবিআই ব্রিকস, এবিসি-ফোর, বিবিসি এবং ডিবিএম ব্রিকস নামের ৪টি ইটভাটার প্রত্যেককে ২ লাখ করে মোট ৮ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।ভ্রাম্যমাণ আদালত সূত্রে জানা যায়, ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩ অনুযায়ী নিবন্ধন না থাকায় ইটভাটা গুলোকে জরিমানা করা হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর ও উপজেলা প্রশাসন মাঝেমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা করলেও ভাটা বন্ধের দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। বরং জরিমানা দিয়েই আবারও আগের মতো অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে মালিকরা। প্রশ্ন উঠছে—প্রশাসনের নাকের ডগায় কীভাবে এতগুলো অবৈধ ইটভাটা গড়ে উঠলো, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই ভাটাগুলো বছরের পর বছর কীভাবে টিকে আছে,জরিমানা কি তবে অবৈধ ব্যবসার লাইসেন্সে পরিণত হয়েছে? পরিবেশ ধ্বংসের এই নীরব মহোৎসবের নেপথ্যে কারা রয়েছে, কার 'ছত্রছায়ায়' বারবার আইন লঙ্ঘন করেও নিরাপদে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে ইটভাটা মালিকরা—সেই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাই সচেতন মহল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বান্দরবান জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক রেজাউল করিম বলেন,অবৈধ ইটভাটা গুলোর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে গত নভেম্বর মাসে দুইবার আক্রমণ এর শিকার হয়েছি।রাজনৈতিক পরিচয়ে কিছু লোক পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের উপর 'চড়াও' হয়ে ইটভাটাগুলো পরিচালনা করে আসছেন। অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান চলমান রয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: বিল্লাল হোসেন
www.e.bdprotidinkhabor.com
Copyright © 2026 বাংলাদেশ প্রতিদিন খবর. All rights reserved.