

মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) কে ফেসবুকে কঁটুক্তিকারী ভারতের বিজেপি নেত্রী নূপুর শর্মার ছবি দিয়ে নড়াইলের মির্জাপুর কলেজের এক ছাত্রের পোস্ট দেওয়ার ঘটনায় অভিযুক্ত ছাত্র ও কলেজের অধ্যক্ষকে জুতার মালা গলায় পরিয়ে দেওয়ার ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।
ছবিতে দেখা গেছে অধ্যক্ষকে জুতার মালা দিয়ে কলেজ থেকে বের করার সময় তার (অধ্যক্ষ) দু’পাশে অর্ধ শতাধিক পুলিশ প্রহরায় ছিলেন।
এদিকে সোমবার এ ঘটনায় জেলা প্রশাসনের আয়োজনে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে বিভিন্ন মসজিদ ও মাদ্রাসার ঈমাম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খৃষ্টান ঐক্য পরিষদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও শ্রেণি-পেশার মানুষদের নিয়ে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমানের সভাপতিত্বে পুলিশ সুপার প্রবীর কুমার রায়, নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর রবিউল ইসলাম, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডঃ সুবাস চন্দ্র বোস, নড়াইল পৌর মেয়র আনজুমান আরা, মির্জাপুর ইউনাইটেড কলেজের সভাপতি অ্যাডঃ অচীন চক্রবর্ত্তী, নড়াইল শাহাবাদ কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওঃ মোঃ আনোয়ার হোসেন, হিন্দু বৌদ্ধ খৃস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি মলয় নন্দী সহ অনেকে এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
সভায় জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ সুপার বলেন, ঘটনার দিন আমাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল সহিংসতা এড়াতে সবাইকে নিরাপদে বাঁচিয়ে আনা। আমরা অধ্যক্ষের গলায় পুলিশের মালা দেওয়ার বিষয়টি দেখিনি, এ সময় গেটের কাছে ছিলাম। ঘটনাটির প্রকৃত তদন্তের জন্য অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ জুবায়ের হোসেন চৌধুরীর নেৃতৃত্বে এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ রিয়াজুল ইসলামের নেতৃত্বে পৃথক দু’টি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তের পর সার্বিক বিষয়ে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান।
সভায় অধিকাংশ বক্তারা অভিযুক্ত ছাত্রের বিচার দাবি করেছেন, তবে আইন হাতে তুলে নিয়ে ৩শিক্ষকের মোটরসাইকেল পোড়ানো এবং নিরাপরাধ অধ্যক্ষের গলায় মালা পরানোর বিষয়টি শাস্তির আওতায় আনার দাবি তোলেন। এদিকে কয়েক বক্তা সহিংসতা চলাকালীন সময়ে মির্জাপুর কলেজের শিক্ষক আক্তার হোসেন কিংকু নিজে অধ্যক্ষ হওয়ার মানসে ছাত্র ও জনতাকে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে শ্লোগান ও উষ্কে দেওয়ার অভিযোগ আনেন।
এদিকে রবিবার (২৬জুন) বিকেলে সরেজমিনে সদরের সিঙ্গাশোলপুর ইউনিয়নের হিন্দু অধ্যুষিত বড়কুলা গ্রামে ওই অধ্যক্ষের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, অধ্যক্ষ বাড়িতে নেই। বাড়িতে অধ্যক্ষের মা বনলতা বিশ্বাস এবং তার অনার্স পড়–য়া বড়ো মেয়ে শ্যামা বিশ্বাস রয়েছেন। শ্যমা বিশ্বাস বলেন, বাবা নড়াইল শহরে কোনো এক আত্নীয়ের বাসায় আছেন। সে জানায়, তার বাবা সম্পূর্ণ নির্দোষ। আর কিছু বলতে চাননি।
এদিকে অভিযুক্ত ছাত্রের বাড়িপার্শ্ববর্তী বিছালী ইউনিয়নের আড়পাড়া গ্রামে এ ঘটনার পর তার বাবাও বাড়িতে নেই। তার মা ও অপর এক ছেলে বাড়িতে রয়েছেন।
মির্জাপুর ইউনাইটেড কলেজের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলেজের কয়েক শিক্ষক বলেন, অধ্যক্ষ কোনো অন্যায় না করলেও তাকে এভাবে অপমান করায় তিনি আতংকিত হয়ে পড়েছেন। কলেজের শিক্ষকদের মধ্যে গ্রুপিং এবং অধ্যক্ষের পদ দখলের অভিপ্রায়ের কারণে তাকে আজ এই চরম অপমান সইতে হয়েছে বলে মন্তব্য করেন।
মির্জাপুর ইউনাইটেড কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও শিক্ষক নেতা রওশন আলী বলেন, যা ঘটেছে তা জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক ও হতাশাজনক। এ ঘটনা শিক্ষক সমাজ হেও করা হয়েছে। ঘটনার আরও ভালো সমাধান হতে পারতো।
মির্জাপুর কলেজের অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাস ঘটনার পর থেকে তার ব্যবহৃত ফোন বন্ধ রেখেছেন।
এদিকে অভিযোগের তীর তোলা মির্জাপুর ইউনাইটেড কলেজের প্রভাষক ও বর্তমার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত আক্তার হোসেন টিংকু এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ঘটনা শুরুর আগে একটি ক্লাস নেই, পরে অপর ক্লাস নেওয়ার সময় অধ্যক্ষ আমাকে ডাকলে সেখানে যাই এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনের চেষ্টা করি। এখানে অধ্যক্ষ হওয়ার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। যারা এসব কথা ছড়াচ্ছেন তারা জামায়াত-বিএনপির সমর্থক।
মির্জাপুর ইউনাইটেড কলেজ পরিচালনা পরিষদের সভাপতি ও সদর উপজেলা আ’লীগ সভাপতি অচিন চক্রবর্ত্তী বলেন, ঘটনার দিন আমি ঢাকায় ছিলাম, শুনেছি কলেজের অধ্যক্ষকে জুতোর মালা দেওয়া হয়েছে, যা অতিব দুঃজনক। তিনি আরও বলেন, এ ঘটনার পর কলেজ বন্ধ রয়েছে। প্রশাসনের নির্দেশে পরিস্থিতি বিবেচনায় ঈদের পর কলেজ খুলবে।
প্রসঙ্গত, মির্জাপুর ইউনাইটেড কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র রাহুল দেব রায় নিজের ফেসবুক আইডিতে নূপুর শর্মার ছবি দিয়ে মন্তব্য করেন, “প্রনাম নিও বস ‘নূপুর শর্মা’ জয় শ্রী রাম”। গত ১৮ জুন রাহুল কলেজে আসার পর তার সহপাঠিরা বিষয়টি কলেজ অধ্যক্ষকে জানালে তিনি উপস্থিত শিক্ষকদের পরামর্শক্রমে রাহুলকে স্থানীয় বিছালী পুলিশ ফাঁড়ির পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এরই মধ্যে শিক্ষার্থীসহ স্থানীয়রা বিক্ষুদ্ধ হয়ে ক্যাম্পসে শিক্ষকদের ৩টি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে ফেলে। একপর্যায়ে পুলিশের লাঠিচার্জ ও এলাকাবাসীর ইটপাটকেল নিক্ষেপে কলেজ শিক্ষক,পুলিশসহ সহ ১২জন আহত হয়। বিকেলে পুলিশ সুপার প্রবীর কুমার বিশ্বাসসহ অন্যান্য উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনেো আনেন এবং এ সময় অভিযুক্ত রাহুল ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে বের করে আনার সময় কয়েকজন উশৃংখল মানুষ তাদের গলায় জুতার মালা পড়িয়ে দেয়। জুতার মালা পরা অবস্থায় পুলিশ ব্যারিগেট দিয়ে ঐ স্থান থেকে তাদের বের করে নিয়ে আসে। পরে অধ্যক্ষকে ছেড়ে দেয়া হয় এবং অভিযুক্ত রাহুলকে আটক করে পরদিন তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করে। সে বর্তমারে কারাগারে আছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: বিল্লাল হোসেন
www.e.bdprotidinkhabor.com
Copyright © 2026 বাংলাদেশ প্রতিদিন খবর. All rights reserved.